সম্প্রতি কয়েক বছরে খেজুরের গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াতে খেজুরের গুড়ের উৎপাদন কমেছে সেইসাথে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে খেজুর গুড়ের চাহিদা যথেষ্ট বেড়েছে এমনকি দেশের বাইরে এর চাহিদা মোটামুটি ভালো আছে। আগের মতো গ্রামের ফসলের জমিতে এবং রাস্তার দুই পার্শ্বে খেজুরের গাছ দেখতে পাওয়া যায় না। শীতকাল আসলে খেজুরের রস এবং গুড়ের কথা মনে পড়ে। শীতকালীন বিভিন্ন পিঠা তৈরিতে খেজুরের গরম রস এবং গুড় ব্যবহৃত হয়। প্রথম দিকে নলেন গুড়ের বাসনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
খেজুরের গুড়ের ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক। যশোর জেলা খেজুর গুড়ের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলা খেজুর গুড়ের জন্য জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জে দেশের অন্যতম খেজুর গুড়ের হাট বসে। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার খয়েরহুদা, রায়পুর, সুটিয়া, শ্রীরামপুর, হাসাদাহ, করিমপুর এবং তারিণীবাস গ্রামের বেশ কিছু কৃষকেরা খেজুর গুড় উৎপাদন করে সেগুলো বিক্রয় করে যথেষ্ট লাভবান হয়েছে। তবে বেশিরভাগ গাছিরা অন্যের গাছ লিজ নিয়ে গুড় তৈরি করে। করিমপুর বাজার হতে তালপুকুর যাওয়ার রাস্তায় এবং বেনে রাস্তায় প্রচুর খেজুর গাছ দেখতে পাওয়া যায়। তারিণীবাস গ্রামে অনেক খেজুর গাছ আছে এছাড়া কিছু কিছু কৃষকেরা নিজ জমিতে খেজুরের বাগান করেছে।
জীবননগর উপজেলার সুটিয়া গ্রামের খেজুর গাছি শরীফ উদ্দিন শান্তির সাথে কথা বলে জানা9 যায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে খেজুরের গুড় উৎপাদন করে আসছেন। তিনি এটা শিখেছিলেন তার পিতা রবিউল ইসলাম বুড়োর কাছে থেকে। তবে বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারনে গুড় উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুটিয়া - শ্রীরামপুর সড়কে কিছু খেজুর গাছ এবং ফসলের মাঠের কিছু গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে তিনি গুড় তৈরি করছেন। অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি খেজুর গাছের মাথার কিছু অংশ ছাঁটাই করার মাধ্যমে প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেন। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ২ য় ধাপের কাজ শেষ করে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খেজুরের রস সংগ্রহ করে সেটা অ্যালুমিনিয়াম এর পাত্রে ঢেলে আগুনে জ্বাল দেওয়ার মাধ্যমে গুড় তৈরি করতে শুরু করেন। তিনি বলেন এক ভাড় রস হতে ১.৫ কেজি গুড় এবং ৯ ভাড় রস হতে ১ ভাড় গুড় উৎপাদিত হয়।
প্রথম দিকে তিনি ১ কেজি খেজুরের গুড় ৩৫০ টাকা মূল্যে বিক্রি করেন এবং পাটালি ৪০০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রয় করেছেন। তবে গাছের মালিকদের প্রতিটা খেজুর গাছের জন্য ২ কেজি করে গুড় দিতে হয়। বিকেলে গাছ কেটে এসে ফজরের নামাজের পর রস ভাড়ে ঢেলে বাকে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। তার ছেলে আসমাউল এইকাজে তাকে সহায়তা করে এবং তার স্ত্রী রস পাত্রে ঢেলে আগুনে জ্বাল দিয়ে থাকেন। জ্বালানির উপকরণ হিসেবে তিনি খেজুর গাছের বেগলো, ধানের বিচালি, আখের ছোবড়া এবং ঝোড় গাছ ব্যবহার করে থাকেন। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি খেজুরের রস সংগ্রহ করে থাকেন। অধিকন্তু এক ভাড় রস তিনি ২০০ টাকাতেও বিক্রি করে থাকেন। খেজুর গাছ হতে রস গুড় বিক্রি করে তিনি প্রতি বছর শীতকালীন সময়ে বেশকিছু অর্থ উপার্জন করে থাকেন। শান্তি ছাড়াও গ্রামের অন্যান্য গাছীরা হলেন রাজ্জাক, ইনুচ, জাইদুল, খোকন। পুরাতন গাছী আয়েব বিশ্বাস বৃদ্ধ হওয়াতে গাছ হতে রস সংগ্রহ করতে না পারলেও তিনি তার জমিতে অল্প সময়ে ১০০ টি খেজুর গাছের চারা লাগিয়েছেন যেগুলো হতে কয়েক বছরের মধ্যে রস সংগ্রহ করা যাবে। বর্তমানে তিনি জীবিত নেই, তবে তার নিজের তৈরি করা খেজুর গাছের বাগান আছে।
খেজুরের গুড় খেতে সুস্বাদু এবং এতে অনেক পুষ্টি উপাদান আছে যেগুলো সাস্থ্যের জন্য ভালো। তবে খেজুর গাছ এখন দেশের গুটিকয়েক জেলাতে আছে এবং এভাবে চলতে থাকলে হয়তো অল্প কয়েক বছরের মধ্যে দেশ হতে খেজুর গাছ বিলুপ্তপ্রায় হবে। তাই সকলের উচিত তাদের আবাদী / অনাবাদী জমিতে এমনকি রাস্তার দুই পার্শ্বে খেজুর গাছ লাগানো। শীতের সময় সরিষা ক্ষেত এবং খেজুরের গাছে ভাড় টাঙানো ছবি একসাথে দেখতে ভালো লাগে। খেজুর গাছের সংখ্যা এভাবে কমতে থাকলে চুয়াডাঙ্গার বিখ্যাত গুড় ও পাটালি শিল্প তার ঐতিহ্য হারাবে। এজন্য কৃষি বিভাগ হতে গাছ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে, অবৈধ গাছ কাটা বন্ধ করা এবং নতুন গাছ লাগাতে হবে, গাছিদের উৎসাহিত করতে হবে এবং তাদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে, ভেজাল গুড় প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
পরিশেষে, চুয়াডাঙ্গার খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য বাঁচাতে হলে এখনই সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, অন্যথায় এই মধুবৃক্ষ ও এর থেকে প্রাপ্ত সুস্বাদু গুড় হয়তো হারিয়ে যাবে।
1 Comments
Very nice
ReplyDelete