বিকেলের কণ্ঠস্বর ডেস্ক : সুনামগঞ্জে গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সীমান্ত নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের একটি গ্রামীণ সড়কের বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এতে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত বিঘা জমির আধাপাকা ও পাকা বোরো ধান। শেষ মুহূর্তে এসে ফসল হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
বাঁধ ভেঙে বিপত্তি স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার পাহাড়ি ঢলের চাপে মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সড়কের জামগড়া খালের বাঁধটি ভেঙে যায়। এর ফলে দ্রুতবেগে পানি ইরানবিল হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় হাওরের নিচু এলাকার ধান মুহূর্তেই তলিয়ে যায়। কৃষকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও পানি আটকানো বা দ্রুত ফসল কাটার সময় পাচ্ছেন না।
কৃষি বিভাগের তথ্য জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। ইকরাছই হাওরের এরানবিল অংশে প্রায় ১১৪ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৪০ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হলেও পানির নিচে রয়েছে বড় একটি অংশ। বর্তমানে প্রায় ১০ হেক্টর জমি সরাসরি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে, যা ক্রমেই বাড়ছে।
অসহায় কৃষক ও শ্রমিক সংকট হাওর ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া সোনালি ধানের সমারোহ থাকলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন প্রবেশ করতে পারছে না। আবার শ্রমিকের তীব্র সংকটের কারণে হাতে ধান কাটতেও হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ভয়—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে হাওরজুড়ে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান,
"থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার কারণে বাঁধগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলের বাড়তি চাপ সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।"
এদিকে মধ্যনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, পাহাড়ি ঢলে কানাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় খালের বাঁধটি ভেঙে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি বিভাগ কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছে এবং যেসব ধান আংশিক পেকেছে সেগুলো দ্রুত তুলে নেওয়ার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মাইকিং ও শ্রমিক সহায়তার চেষ্টা চলছে।
উৎকণ্ঠায় হাওরবাসী বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের কৃষক জসীম উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, "সারা বছরের খোরাক এই বোরো ধান। চোখের সামনে পানির তলে ধান চইলা যাইতেছে, কিচ্ছু করার নাই। বাঁধটা যদি মজবুত হইত, তাইলে আজকের এই দিন দেখা লাগত না।"
প্রকৃতির বৈরী আচরণ আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের হাজারো কৃষকের স্বপ্ন এখন পানির নিচে। এই মুহূর্তে সরকারি তদারকি ও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করলে ফসলের ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

0 Comments