![]() |
| সংগৃহীত ছবি |
বিকেলের কণ্ঠস্বর ডেস্ক :
২১ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা, কত শত সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের ক্লান্তি। অবশেষে মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কাটল সেই জয়খরা। ২০০৫ সালে কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেই মহাকাব্যিক সেঞ্চুরির পর, ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ। কাকতালীয়ভাবে, সেই আশরাফুলই আজ দলের ব্যাটিং কোচ; আর তাঁরই অধীনে ঘরের মাঠে বাঘেরা হুঙ্কার দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখল। বৃষ্টির বাধায় ডিএলএস (DLS) পদ্ধতিতে ৮৬ রানের এই রাজসিক জয়ের মহানায়ক আর কেউ নন—চার বছর পর জাতীয় দলে ফেরা অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত।
রাজসিক প্রত্যাবর্তন ও মোসাদ্দেক-কাব্য
২০২২ সালের পর দেশের জার্সিতে ৬৩টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলা হয়নি তাঁর। ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের পাহাড় আর উইকেটের ফুলঝুরি ছুটিয়ে নির্বাচকদের বাধ্য করেছিলেন দলে ফেরাতে। আর ফিরেই ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের নতুন পথচলার গান শোনালেন মোসাদ্দেক।
টসে হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ যখন দ্রুত উইকেট হারিয়ে চাপে, ঠিক তখনই তাওহীদ হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে ৭৫ রানের এক দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি। ক্রিজে এসেই প্রথম বলে ৩ রান নিয়ে খাতা খোলা মোসাদ্দেক ছিলেন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। অ্যাডাম জাম্পাকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা, ক্যামেরুন গ্রিনকে বাউন্ডারি কিংবা রেনশকে লং অফ দিয়ে ওড়ানো বিশাল ছক্কা—সব কিছুতেই ছিল রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের ছাপ। শেষ পর্যন্ত ৭০ বলে ৭টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৮৬ রানে অপরাজিত থেকে দলকে এনে দেন ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর।
![]() |
| সংগৃহীত ছবি |
ব্যাট হাতে তাণ্ডব চালিয়েই ক্ষান্ত হননি এই অলরাউন্ডার। বল হাতেও ১০ ওভারে মাত্র ৩৭ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট, সঙ্গে ছিল ফিল্ডিংয়ে একটি চোখধাঁধানো ক্যাচ। ম্যাচ শেষে দিনটি তাই একপ্রকার ‘মোসাদ্দেকময়’ বললেও ভুল হবে না।
শান্ত-তানজিদের সুদৃঢ় ভিত
গল্পের শেষটা মোসাদ্দেকের হলেও শুরুটা এনে দিয়েছিলেন ওপেনাররা। সাইফ হাসান দ্রুত বিদায় নিলেও দ্বিতীয় উইকেটে নাজমুল হোসেন শান্ত ও তানজিদ হাসান তামিম ৯৬ রানের জুটি গড়ে বড় স্কোরের ভিত গড়ে দেন। তানজিদ খেলেন ৪৪ বলে ৫৪ রানের এক ঝোড়ো ইনিংস। অধিনায়ক শান্তও (৬৭) তুলে নেন হাফ সেঞ্চুরি। মাঝে লিটন দাস দ্রুত ফিরে গেলে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল স্বাগতিকরা, যা পরবর্তীতে সামাল দেন হৃদয় (৩১) ও মোসাদ্দেক।
নাহিদ রানার আগুনে বোলিং ও তাসকিনের প্রথম বলের আঘাত
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ হেরে বাংলাদেশে আসা অস্ট্রেলিয়ার আত্মবিশ্বাস এমনিতেই ছিল নড়বড়ে। মিরপুরের গতি ও সুইং সহায়ক উইকেটে অজিদের সেই আত্মবিশ্বাসে প্রথম বলেই কুড়াল মারেন তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের প্রথম বলেই ম্যাথু শর্টকে বোল্ড করে গ্যালারিতে উন্মাদনা ছড়ান তিনি।
এরপর শুরু হয় নাহিদ রানার গতির প্রদর্শনী। তাঁর গতি আর বাউন্সারের তোড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডার। ১০ ওভারে মাত্র ৪১ রান খরচায় ৪টি উইকেট শিকার করেন রানা। মাঝপথে ক্যামেরুন গ্রিন এক প্রান্ত আগলে রেখে ফিফটি (৫২) করলেও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে বাকিরা ছিলেন অসহায়।
বৃষ্টি আইন ও উল্লাসের রাত
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস যখন ৪২.২ ওভারে ৯ উইকেটে ১৯১ রান, ঠিক তখনই মিরপুরের আকাশে নামে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, সঙ্গে বজ্রপাত। আম্পায়াররা খেলা বন্ধ করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত আর খেলা মাঠে না গড়ালে ডিএলএস (বৃষ্টি) আইনে ৮৬ রানে জয়ী ঘোষিত হয় বাংলাদেশ।
স্কোরবোর্ডের এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জয় নয়; বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের এক নতুন ও শক্তিশালী বার্তা। রাতের মিরপুর মেতেছিল এক অবিস্মরণীয় বিজয়ের উল্লাসে, যেখানে রূপকথার নায়ক হয়ে রইলেন ফিরে আসা এক লড়াকু সৈনিক—মোসাদ্দেক হোসেন।


0 Comments