চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের এক প্রাকৃতিক স্বর্গরাজ্য ‘বেনীপুর বাওড়’। ইংরেজি ‘U’ আকৃতির ১১৫ একরের এই বিশাল জলমহাল ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে মেছো বিড়াল, হনুমান ও বাদুড়সহ বিভিন্ন বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এক ব্যতিক্রমী অনুসন্ধান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
আজ ১৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ‘Bangladesh Wildlife And Nature Initiative’-এর উদ্যোগে বেনীপুর, ধান্যখোলা ও কুসুমপুর গ্রামের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই সচেতনতা কর্মসূচি ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান চালানো হয়।
জলমহালের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ
১১৫ একর আয়তনের এই ঐতিহ্যবাহী জলমহালটির উত্তর প্রান্তে ধান্যখোলা, দক্ষিণে চাপাতলা, পূর্বে কুসুমপুর এবং পশ্চিমে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অবস্থিত। বাওড়টির পশ্চিম দিক থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরত্বে বয়ে গেছে ঐতিহাসিক ইছামতী নদী। ইছামতী নদীর সাথে সরাসরি প্রাকৃতিক সংযোগ থাকার কারণে এই বাওরে কোনো কৃত্রিম সেচের প্রয়োজন হয় না, যা এর প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে শত বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে।
বাওরের পশ্চিম দিকে রয়েছে ঘন ঝোপঝাড় এবং পূর্ব দিকে মহেশপুরের ‘বার তলা’ নামক স্থানে রয়েছে এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ বয়স্ক উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত একটি প্রাচীন মহীরুহ বটগাছ। বাওরের অফিস সংলগ্ন এলাকায় দর্শনার্থী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বসার যে অপূর্ব সুব্যবস্থা রয়েছে, তা এককথায় অতুলনীয়।
বন্যপ্রাণীর বিচরণ ক্ষেত্র ও স্থানীয় অবদান
বাওড় সংলগ্ন মেন্দের মাঠ, মশুমখালী, ঘোনার মাঠ এবং চাপাতলার মাঠগুলো স্থানীয় বন্যপ্রাণীদের প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বেনীপুর বাওড়ের পাড় ঘেঁষে দৃশ্যমান অসংখ্য বাবলা ও নিম গাছের সারি প্রকৃতিকে এক অন্যরকম রূপ দিয়েছে, যার বয়স বর্তমানে প্রায় ১৫ বছর। স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী খলিলুর রহমান নামের একজন সাধারণ মানুষের একক চেষ্টায় দৃশ্যমান হয়েছিল এই গাছের সারি। খলিলুর চাচা আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই, কিন্তু প্রকৃতির প্রতি তার এই অনন্য অবদান আজীবন অনস্বীকার্য হয়ে থাকবে। বাওড় পরিদর্শনের সময় স্থানীয় বাসিন্দা আনিচুর ও নাইমুর সার্বিক তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান দলকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন।
বিপন্ন হনুমান ও বাদুড় দল: বাসস্থান ও খাদ্য সংকটের আকুতি
অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, এই অঞ্চলে একাধিক হনুমানের দল বিচরণ করছে। স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুল ইসলাম ভাই দীর্ঘ প্রায় এক যুগ (১২ বছর) ধরে নিজের সন্তানের মতো এই হনুমানগুলোর দেখাশোনা করে আসছেন। বর্তমানে এই হনুমানগুলো ৭টি দলে বিভক্ত হয়ে ভবানীপুর, কুসুমপুর, ধান্যখোলা ও বেনীপুর এলাকায় অবস্থান করছে। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এরা বর্তমানে তীব্র খাদ্য ও বাসস্থান সংকটে ভুগছে।
একইভাবে ধান্যখোলা গ্রামে একটি বিশাল রেইনট্রি এবং চটকা গাছে শতশত বড় বাদুড়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। আশার কথা হলো, স্থানীয় গ্রামবাসীরা অত্যন্ত সচেতন। কেউ বাদুড় শিকার করতে আসলে গ্রামের মানুষ দলবদ্ধভাবে তাদের প্রতিহত করে।
কর্মসূচি চলাকালীন ‘Bangladesh Wildlife And Nature Initiative’-এর সভাপতি আহসান হাবীব শিপলু বলেন,
"বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব সংকটের প্রধান কারণ হলো তাদের খাদ্য ও বাসস্থানের অভাব। বন বিভাগের উদ্যোগে এই এলাকায় অতি দ্রুত বন্যপ্রাণীদের জন্য স্থায়ী বনভূমি তৈরি করতে হবে এবং সেখানে প্রচুর পরিমাণে ফলজ গাছ রোপণ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এরা আর মানুষের ফসলের ক্ষতি করবে না এবং এদের অস্তিত্বও সুরক্ষিত থাকবে।"
প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুল ইসলামও হনুমান ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং বসবাসযোগ্য সরকারি অভয়ারণ্য গড়ে তোলার জোর দাবি জানান।
কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের মাঝে সচেতনতার বার্তা
পরিদর্শন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুল ভাইয়ের সহযোগিতায় কুসুমপুর কওমি মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের মাঝে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও এ সংক্রান্ত আইন বিষয়ক এক বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক এই মহতি উদ্যোগের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিকতা প্রদর্শন করেন এবং ছাত্রদের প্রকৃতির প্রতি সদয় ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করার আহ্বান জানান। বন্যপ্রাণীর সাথে মানুষের একটি সুন্দর ও নিরাপদ সহাবস্থান সৃষ্টি করাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
প্রকৃতির সুরক্ষায় একাত্মতা
‘Bangladesh Wildlife And Nature Initiative’-এর এই মহতি কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে স্থানীয় স্তরে অনন্য সহযোগিতা প্রদান করেছেন আব্দুর রাজ্জাক চাচা, খোদা বক্স চাচা এবং আনিছুর রহমান চাচা। এছাড়াও প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুল ভাই ও ‘বিকেলের কণ্ঠস্বর’-এর সম্পাদক পলাশ আহাম্মদ খান মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থেকে এই কার্যক্রমকে আরও বেগবান করেছেন। আজকের অনুসন্ধান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ দুই সদস্য ফারদিন ফারাবি ও সাব্বির হোসেন মুন্না।
সংগঠনের সভাপতি আহসান হাবীব শিপলু সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "মানুষের সভ্যতার সাথে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আসুন, আমরা সকলে মিলে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি রক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি।"





0 Comments