বিকেলের কণ্ঠস্বর ডেস্ক :
ঘন জঙ্গল নয়, একসময় মানুষের বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে, গাছের কোটর, মাটির ঘরের চালের ফাঁকা জায়গা কিংবা সবজির মাচায় বাসা বাঁধতেই ভালোবাসত বাংলার ঐতিহ্য ও জাতীয় পাখি দোয়েল। মানুষের প্রতিবেশী হিসেবে পরিচিত এই পাখিটির মধুর শিস আর উপস্থিতি ছিল গ্রামীণ জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আধুনিকায়নের এক প্রবল ঝড়ে আজ গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দোয়েল। বাসস্থান ও খাদ্যের তীব্র সংকটে ভুগছে এই পাখিটি, যা একে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে বিলুপ্তির অতল গহ্বরে।
সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতে জানা গেছে, এই বিপন্ন অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ একাধিক। প্রথমত, আধুনিকায়নের ফলে গ্রামগুলোতে আগের মতো ঝোপঝাড় ও পুরনো বড় গাছপালা নেই। কাঁচা বা মাটির ঘর উধাও হয়ে ইট-কংক্রিটের পাকা বাড়ি তৈরি হয়েছে, ফলে পাখিটির বাসা তৈরির জায়গা কমে গেছে। হারিয়ে গেছে খড়ের চাল, যেখানে দোয়েল নিভৃতে তার ছানা বড় করত।
তবে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী আঘাত এসেছে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা থেকে। ফসলের জমিতে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিদের প্রধান খাদ্য পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বেঁচে থাকা সামান্য কিছু কীটনাশক-সংক্রমিত পোকা খেয়ে দোয়েল পাখি বিষক্রিয়ায় অকালেই প্রাণ হারাচ্ছে। কৃষি কাজে ক্ষতিকর পোকা দমনে যে প্রাকৃতিক ভূমিকা দোয়েল পালন করত, তা এখন সম্পূর্ণ ব্যাহত।
পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ুর আকস্মিক পরিবর্তন। অপ্রত্যাশিত ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ঋতু পরিবর্তনের অনিয়মের কারণেও দোয়েলের স্বাভাবিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাসা ভেঙে যাওয়া বা ছানার মৃত্যু আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
জনমানুষের এই চিরচেনা পাখিটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, ফসলি জমিতে জৈব সার ও প্রাকৃতিক বালাইনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, ‘পাখির দেশ বাংলাদেশ’ থেকে এই সুন্দরী জাতীয় পাখিটি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে, শুধু ছবির পাতাতেই স্মৃতি হয়ে থাকবে এর নাম।

0 Comments