![]() |
| আরআরএফ এর উদ্যোগে সোলার পাম্প স্থাপন |
বিকেলের কণ্ঠস্বর ডেস্ক : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী অবহেলিত ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে কৃষি ও টেকসই জ্বালানির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর কারিগরি সহায়তায় শুরু হয়েছে এক নীরব ‘সোলার বিপ্লব’। রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশন (আরআরএফ) কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক এই প্রযুক্তির ছোঁয়া এখন পৌঁছে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ চাষীদের দোরগোড়ায়।
বর্তমানে বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তন এবং তীব্র জ্বালানি স্বল্পতার এই সংকটকালে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবহার সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে যশোর ও ঝিনাইদহ জেলার ১৭টি ইউনিয়নে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘স্মার্ট’ উপ-প্রকল্প। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে আরআরএফ প্রথমবারের মতো পিকেএসএফ-এর সরাসরি কারিগরি সহযোগিতায় এই যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য—ক্ষুদ্রঋণ ও অনুদানের সমন্বয়ে প্রান্তিক চাষী পর্যায়ে সোলার পাম্পের সুবিধা নিশ্চিত করা, যা একই সাথে সেচ খরচ কমাবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।
![]() |
| সোলার পাম্পের মাধ্যমে ফুলের জমিতে সেচ প্রদান |
সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রযুক্তির ছোঁয়া ও জীবনমান উন্নয়ন
বিশেষ করে ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। এই অবহেলিত অঞ্চলের কৃষকদের আধুনিক সেচ সুবিধার আওতায় আনতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আরআরএফ। ইতিমধ্যেই মহেশপুর উপজেলার নেপা, কাজীরবেড় এবং শ্যামকুড় ইউনিয়নে সফলভাবে ১০টি সোলার পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসেই আরও ১০টি সোলার পাম্প স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
প্রকল্পের এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোশ্যাল অফিসার বাপ্পী কুমার অধিকারী বলেন, "আমরা সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত এলাকাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছি। অবহেলিত সীমান্তবর্তী মানুষের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার সুফল ইতিমধ্যে অত্র এলাকার মানুষজন পেতে শুরু করেছেন। তাছাড়া, পরিবেশ ক্লাবের মাধ্যমেও পরিবেশ সচেতনতার প্রচারণা আমরা অব্যাহত রেখেছি।"
জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কৃষিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রথাগত ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পের ব্যবহার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে। এটি একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাবে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে।
স্মার্ট প্রকল্পের ফোকাল পারসন কৃষিবিদ ড. অসিত বরণ মন্ডল এই কার্যক্রমের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সম্পর্কে বলেন, "আমরা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি, যার মধ্যে সোলার অন্যতম। সোলার বিপ্লবের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি স্বল্পতা দূরীকরণে আরআরএফ-এর এই কার্যক্রম আগামী দিনে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করবে।"
প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আরআরএফ স্মার্ট প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোতে এ পর্যন্ত ১৩টি শক্তিশালী সোলার পাম্প স্থাপন করেছে। শুধু সেচ কাজেই নয়, গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে নেওয়া হয়েছে অভিনব উদ্যোগ। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় ১৭টি এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট (সার ও কীটনাশক) দোকানে ১৭টি সোলার অপারেটর সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে লোডশেডিংয়ের মধ্যেও কৃষকদের জরুরি সেবা প্রদান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সহজ হচ্ছে। আরআরএফ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে এই পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের পরিধি আরও বৃদ্ধি করা হবে।
সৌরশক্তির এই কার্যকর ব্যবহার গ্রামীণ জনপদে শুধু অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যই আনছে না, বরং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে এবং জলবায়ু সহনশীল স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।



0 Comments