বিকেলের কণ্ঠস্বর ডেস্ক :
মৃদু বাতাসে পানির ছোট ছোট ঢেউয়ের কলতান, জলচর পাখিদের কলকাকলি আর ডানা ঝাপটানোর শব্দ—যে দৃশ্য চুয়াডাঙ্গার মানুষকে শত শত বছর ধরে এক স্বপ্নের ভূবনে নিয়ে যেত, তা আজ কেবলই স্মৃতি। চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার বাঁকা ইউনিয়নের বিএডিসি মাঠ সংলগ্ন ঐতিহাসিক ‘পদ্মবিল’ আজ এক ধূসর মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এটি পদ্মগঙ্গা বিল নামে পরিচিত। অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে পুরো একটি অঞ্চলের সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম।
বন্যপ্রাণীর স্বর্গরাজ্য থেকে ধ্বংসস্তূপ
পদ্মবিল কেবল একটি জলাশয় ছিল না; এটি ছিল চুয়াডাঙ্গা জেলার মধ্যে অসংখ্য প্রজাতির পাখির প্রধান আবাস্থল এবং বিভিন্ন স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রথম পছন্দের স্থান ছিল এই বিল।
বিলটির এই করুণ দশা নিয়ে ‘বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ এন্ড নেচার ইনিশিয়েটিভ’-এর সভাপতি মো. আহসান হাবীব শিপলু গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান,
"গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর (১৩/১২/২০২৫) আমি এবং সামাজিক বন বিভাগ কুষ্টিয়ার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জনাব মো: রেজাউল আলম এই বিলটি পরিদর্শনে আসি। এত বন্যপ্রাণের প্রাচুর্য দেখে তিনি নিজে অভিভূত হয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে আজ সেখানে গিয়ে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠেছে। সেই পানির কলতান নেই, বন্যপ্রাণের ছন্দ নেই। শত শত বছরের চেনা দৃশ্য আজ উধাও।"
যেভাবে ধ্বংসের মুখে পড়ল পদ্মবিল
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সুটিয়া গ্রামের বাবু নামের এক ব্যক্তি এই পদ্মবিল ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করে আসছিলেন। তবে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন) তাদের নিজেদের জায়গা চিহ্নিত করতে গিয়ে বিলের চারপাশে বড় করে পাড় বা বাঁধ নির্মাণ করে। এর ফলে বিশাল বিলটি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
শুরুতে পানি থাকার কারণে বন্যপ্রাণীগুলো কোনোমতে টিকে থাকার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। বিলের অস্তিত্ব রক্ষায় পরিবেশবাদীরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আশ্বস্তও করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের রদবদলের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। স্থানীয় বন্যপ্রাণী কর্মী জনাব জহিরুল ইসলামসহ অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে বিলটি বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ফলশ্রুতিতে, আজ পুরো জলাভূমিটি শুকিয়ে মরে গেছে।
"বংশপরম্পরার ঘর হারালে কেমন লাগত?"
শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় যে জলচর পাখি ও বন্যপ্রাণীগুলো এই বিলকে নিজেদের ঘর বানিয়েছিল, আজ তারা বাস্তুচ্যুত। পরিবেশবাদীদের প্রশ্ন, "ভাবুন তো, শত শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় আপনার যে গ্রাম বা বাড়ি, কেউ যদি তা পুরো ধ্বংস করে দেয় তবে আপনার কেমন লাগবে? হয়তো এই নির্বাক বন্যপ্রাণীগুলোর আর্তনাদ আমাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না, কিন্তু প্রকৃতির ওপর এই অন্যায় মেনে নেওয়া যায় না।"
বর্তমান সংকট ও করণীয়
পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, চুয়াডাঙ্গার এই অন্যতম প্রধান জলাভূমিকে এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
- বর্ষার পানি সংরক্ষণ: সামনে বর্ষা মৌসুম আসছে। এখন এই বিলের নিচু জায়গাগুলোতে বর্ষার পানি ধরে রাখার বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
- বিএডিসি-র নীতি শিথিলকরণ: বিএডিসি বর্তমানে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পূর্বে যেভাবে বিলের ক্ষতি না করে কৃষি ও প্রকৃতি একসাথে চলেছে, সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে বিএডিসি কর্তৃপক্ষকে কিছুটা ছাড় দিতে হবে।
- যৌথ উদ্যোগ: স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং বিএডিসি-কে একসাথে বসে এই কৃত্রিম মরুভূমিকে পুনরায় জলাভূমিতে রূপান্তরের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এক কাতারে দাঁড়ানোর আহ্বান
চুয়াডাঙ্গার ফুসফুস খ্যাত এই পদ্মবিল ও তার বন্যপ্রাণী রক্ষায় এখন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পরিবেশবাদী—সবাইকে এক কাতারে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রকৃতি ধ্বংসের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে দ্রুতই কঠোর কর্মসূচির দিকে যাচ্ছেন স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা।
প্রকৃতির এই নিঃশব্দ আর্তনাদ কি পৌঁছাবে নীতিনির্ধারকদের কানে? নাকি আরও একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে মানচিত্র থেকে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।



0 Comments