চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের খেজুরের গুড়ের বাজার দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী একটি মোকাম, যা প্রতি শীত মৌসুমে (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) সরোজগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বসে। এখানে সপ্তাহে দুই দিন ( সোমবার ও শুক্রবার ) ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা ভিড় করেন। ক্রেতাদের আনাগোনায় মুখরিত থাকে হাটটি, যেখানে নলেন পাটালি, ঝোলাগুড়, দানা গুড় ইত্যাদি বিক্রি হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং প্রতি সপ্তাহে ২০/ ৩০ লাখেরও বেশি টাকার কেনাবেচা হয়। বছরে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা হয় চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের হাটে।
বাজারের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব:
ঐতিহ্য ও ব্যাপ্তি: এটি ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী হাট, যা দেশের বৃহত্তম খেজুর গুড়ের হাট হিসেবে পরিচিত।
- সময়: সাধারণত শীতকালে, বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই হাট বসে এবং সপ্তাহে দুই দিন (শুক্রবার ও সোমবার) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমে ওঠে।
- পণ্য: নলেন পাটালি (প্রথম দিকের উন্নতমানের গুড়), ঝোলাগুড় (তরল গুড়), দানা গুড়, ও চিটাগুড় প্রধানত বিক্রি হয়।
- কেনাবেচা: মাটির ভাঁড় বা হাড়িতে গুড় কেনাবেচা করা হয়। যেখানে প্রতি কেজি গুড়ের দাম ১৮০ - ২২০ টাকা বা তার বেশি থাকে এবং ভাঁড়ের আকার ও ওজনভেদে দাম ভিন্ন হয়।
- অর্থনৈতিক প্রভাব: দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন, যা হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে।
- অধিকন্তু, শীতের তীব্রতা ও খেজুর গাছের রসের প্রাপ্যতার ওপর গুড়ের উৎপাদন ও দাম নির্ভর করে।তবে অনেক সময় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকে, কারণ কৃষকরা গাছ কেটে ফেলছেন বা রস পাওয়া যাচ্ছে না।
শীত মৌসুমে গুড় কিনতে বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে আসেন ব্যাপারীরা। বেচাকেনার জন্য এই হাটের ঐতিহ্য কয়েকশ বছরের। তবে এবার এই হাটে গুড়ের চাহিদা বেশি, কিন্তু সরবরাহ কম। গুড় বহনকারী পিকাপের ড্রাইভার বদিয়ার রহমান বলেন এখানকার গুড় খেতে খুবই স্বাদের এবং দেশে এর যথেষ্ট সুনাম আছে। হাটের শ্রমিক হারুন অর রশিদের কাছে থেকে জানা যায় এসমস্ত মাটির ভাঁড়ে ৮ থেকে প্রায় ১৮ কেজি পর্যন্ত গুড় থাকে। যেগুলো ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়।
হাট সূত্রে জানা গেছে, এই ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জের গুড়ের হাটে প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয় ২০০- ২৫০ টাকা করে। প্রতি সপ্তাহে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার গুড় বেচাকেনা হয়। প্রতিবছর এই হাট থেকে বেচাকেনার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। এই হাটের গুড় দেশের বিভিন্ন জেলায় যেমন ; ঢাকা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, মাগুরা, রাজবাড়ি, পঞ্চগড়, সিলেট, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ছাড়াও অন্যান্য জেলায় এই গুড় সরবরাহ করা হয় এবং এসব এলাকার ক্রেতা/ ব্যবসাদারও এই হাটে গুড় কিনতে আসেন। এই হাটে গুড় বেচাকেনা করে কৃষক ও হাটমালিকরাও লাভবান হয়।
পরিশেষে, চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের গুড়ের হাট ধরে রাখতে হলে ভেজালমুক্ত খাঁটি গুড় উৎপাদন নিশ্চিতকরণ, উন্নত পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদান, এবং হাটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। এছাড়াও নতুন খেজুর গাছ লাগানো এবং পুরনো গাছ পরিচর্যার জন্য কৃষকদের উৎসাহিত ও সহায়তা করা দরকার। "চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের খাঁটি গুড়" হিসেবে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। শুধু শীতকাল নয়, সারা বছর যেন গুড় বিক্রি হয় সেই লক্ষ্যে নতুন বাজার ( অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ) তৈরির চেষ্টা করা।
1 Comments
চমৎকার
ReplyDelete