এক সময়ের কোলাহলপূর্ণ ফেরিঘাট এখন নীরব হয়ে গেছে

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় বেশিরভাগ যানবাহন এখন সড়কপথে পারাপার হচ্ছে, ফলে ফেরিঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ অনেক কমে গেছে। ফেরিঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় খাবার বিক্রেতারা লোকসান গুনছেন এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। 

একসময় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট দক্ষিণ - পশ্চিম বঙ্গের যাত্রীদের রাজধানী শহর ঢাকা ছাড়াও সিলেট, চট্টগ্রাম যাওয়া-আসা আর পণ্যদ্রব্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ রুট ছিলো। পদ্মা সেতু হওয়াতে এই রুটের চাপ অনেক কমে গিয়েছে। এখন আর যাত্রীদের ঘন্টার পর ঘন্টা ফেরিঘাটের জ্যামে আটকা পড়তে হয়না। ঘাটে ফেরি থাকলেই সরাসরি গাড়ি ফেরিতে উঠে পড়ে। পদ্মা সেতু অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে এটা অকপটে স্বীকার করতে হবে।

একদিকে যেমন সময় সাশ্রয় হয়েছে আর অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ভ্রাম্যমাণ খাবারের  হোটেল ব্যবসায়ীরা, কাবুলিওয়ালা, বাদাম - চানাচুর মুড়ি বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতা, গামছা / পোশাক বিক্রেতা, ভ্রাম্যমাণ বই / পত্রিকা বিক্রেতা, হিজড়া এবং গ্রামীণ অর্থনীতি। এখন ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানগুলো সব অচল অবস্থায় আছে। আগে দৌলতদিয়া এবং পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রীদের সবসময় কয়েক ঘন্টার জন্য হলেও জ্যামে আটকা পড়তে হতো সেটা দিন এবং রাতেও। এসমস্ত যাত্রীরা দীর্ঘসময় এখানে অবস্থান করার কারনে ভ্রাম্যমান খাবারের হোটেল ব্যবসায় জমজমাট হতো। এজন্য এই দুই রুটের দুই ধারে অনেকগুলো ছোট-বড় খাবারের হোটেল গড়ে তুলতো স্থানীয়রা যেটা ২ / ৩ কিলোমিটার জায়গা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। বিভিন্ন রকম খাবার বিক্রি করে এসব দোকানদারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হতো এবং তাদের সংসার চলতো এই আয়ের টাকা দিয়ে। পদ্মা সেতু দিয়ে পারাপারের রাস্তা হওয়াতে তাদের আয়ের উৎসগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা নানান কর্মকান্ডের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। এখন সেসমস্ত পন্থাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে গিয়েছে।



আগে এই রুটে বাস, ট্রাক এবং অন্যান্য গাড়ি ভিআইপি করে পারাপার করিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ প্রচুর টাকা কামিয়ে নিতো। মোটকথা এই রুটের জ্যামটা ছিলো মারাত্মক যেটা অসহনীয়। রানা হামিদ নামক একজন বলেন আমি আমার এক আত্মীয়কে ঢাকার বিমান বন্দরে মধ্যপ্রাচ্যে যাবার জন্য তুলে দিয়ে বাড়িতে ফিরছিলাম। আমি পাটুরিয়া ঘাটের জ্যামে আটকা থাকা অবস্থায় তার ফোন আসলো সে সেখানে পৌঁছে খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। অবাক লাগে সে নিজের বাড়িতে পৌছাতে পারলোনা এদিকে বিদেশগামী আরেকজন তার আগেই অন্য দেশে পৌঁছে গিয়েছে। তবে এই ভোগান্তির শেষ হয়েছে। 

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে ছেড়ে আসা রয়েল এক্সপ্রেস বাসের ড্রাইভার স্বপন মিয়া বলেন আগে ঘাটে আসলে ৬ / ৭ ঘণ্টার বেশি জ্যামে থাকতে হতো। যেটা যাত্রীদের জন্য অসুবিধা হতো আর আমাদের জন্যও বেশি অসুবিধা হতো। আমাদের প্রতিনিয়ত গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। জ্যামের কারনে আমরা গাড়ি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় পেতাম না আবার রওনা দিতে হতো। এখন এই ভোগান্তি কমেছে। ঘাটে ফেরি থাকলেই সরাসরি গাড়ি নিয়ে ফেরিতে উঠে পড়ি।

বাপ্পি অধিকারি নামক একজন যাত্রী বলেন আগে ঢাকায় চাকরির পরীক্ষা দেবার জন্য বাসে উঠলে জ্যামের কারনে গাড়ি ঠিক সময় মতো পৌছাতে পারতোনা এজন্য দক্ষিণ-পূর্ব দিকের লোকজন যারা এই রুট দিয়ে আসতো তাদের অনেকের চাকরির পরীক্ষা ধরতে পারতোনা। তবে এখন অফিশ্যল কাজে ঢাকাতে যাওয়া হয়, আর জ্যাম নেই বললেই চলে। অপর এক যাত্রী আবু তালহা বলে এই রুটে আগে হিজড়াদের চান্দা তোলায় যাত্রীরা অতিষ্ঠ হয়ে যেতো। এখন এই উৎপাত থেক রেহাই পেয়েছে। এখন হিজড়াদের আনাগোনা তেমন একটা দেখা যায় না। নদী নামের একজন হিজড়ার সাথে কথা বলে জানা গিয়েছে তারাও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রুট পরিবর্তনের কারনে।



তরিতরকারির পণ্যবাহী পিকাপের ড্রাইভার রফিকুল ইসলামের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে জ্যামের কারণে কাচামাল ঠিক সময়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পৌছানো যেতো না। এজন্য অনেক কাচামাল নষ্ট হতো। তবে এখন খুব অল্প সময় লাগে জ্যাম না থাকাতে।

সবমিলিয়ে পদ্মা সেতু হওয়াতে যাত্রার সময় সাশ্রয় হয়েছে এবং জ্যামের ভোগান্তি থেকে রেহাই পেয়েছে জনগণ। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জ্যামকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা নানান রকমের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে খাবারের হোটেল মালিকেরা।

Post a Comment

0 Comments