" বসন্তে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে ভাটফুল "
বসন্ত ঋতুতে মাঠে প্রান্তরে যে ফুলগুলো সহজেই নজর কেড়ে নিচ্ছে তার অন্যতম হলো বনজুঁই। এই ফুল ভাট ফুল নামেই পরিচিত। মূলত এটি বুনো ফুল। ঋতুরাজ বসন্তে দেখা যায় এই ফুল। ঝোপ-ঝারে, জঙ্গলে, রাস্তার ধারে, এখানে সেখানে নিজের সুন্দর রূপ ছড়িয়ে থাকে ভাট ফুল বা বন জুঁই। শীতের শেষে প্রত্যন্ত পরিত্যাক্ত এলাকাজুড়ে এখন ভাটফুলের রাজত্ব। বুনো এই ফুলটিকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন – বনজুঁই/ ভাট/ ঘেঁটু / ঘণ্টাকর্ণ।
ইংরেজিতে একে বলা হয় হিল গ্লোরি বোয়ার (hill glory bower)। এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্লেরোডেনড্রাম ভিসকোসাম (Clerodendrum viscosum). ভারবেনাসেই (Verbenaceae) গণের এই ফুল ল্যামিয়াসেই (Lamiaceae) পরিবারভুক্ত। এটি ইনফরচুনাটাম (Infortunatum) প্রজাতির এবং বাংলাদেশের আদি ফুল। ভাট ফুল বহুবর্ষজীবী সপুষ্পক উদ্ভিদ। এটা ক্ষুদ্রাকৃতির ঝোপ জাতীয় ফুলগাছ। এর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশে। বাংলাদেশের মাটিতে কোন পরিচর্যা ছাড়াই এই ফুলের গাছ অত্যন্ত অনাদর আর অবহেলায় জন্মে এবং বেড়ে ওঠে। এই গাছ গুল্ম জাতীয়; ছোট আকৃতির ও বেশ ঝোপালো হয়। সবুজ বহুপত্রী ভাট গাছের ফুল ধবধবে সাদা। ফুল ফোটে থোকায় থোকায়। দেশের সর্বত্রই দেখা যায় এই ফুল। তবে ভাওয়াল গড় ও মধুপুর গড় এলাকায় ভাট গাছ প্রচুর জন্মায় এবং ফুলে ফুলে একেবারে ছেয়ে থাকে।
বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার এ ফুলের আদিনিবাস। ভাট গাছের প্রধান কান্ড সোজাভাবে দন্ডায়মান, সাধারণত ২ থেকে ৪ মিটার লম্বা হয়। পাতা ৪ থেকে ৭ ইঞ্চি লম্বা হয়। দেখতে কিছুটা পান পাতার আকৃতির ও খসখসে। ডালের শীর্ষে পুষ্পদণ্ডে ফুল ফোটে। ভাট ফুলের পাপড়ি পাঁচটি এবং পাপড়ির গোড়ার দিকটা হালকা বেগুনি রঙের। প্রতি ফুলে ৪টি করে পুংকেশর সামনের দিকে বেরিয়ে আসে। পুংকেশরের অগ্রভাগ হয় স্ফীত ও কালো। পাপড়ির রঙ সাদা এবং এতে বেগুনি রং এর মিশেল আছে। সাধারণত মার্চ থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এ ফুল গ্রামের মেঠো পথের দু’ধারে ফুটে থাকতে দেখা যায়। এ ফুল থেকে রাতে বেশ মিষ্টি সৌরভ ছড়ায়।
ভাট ফুল গ্রামের মানুষদের কাছে অতিপরিচিত। গ্রামের শিশুদের খেলার উপকরণ হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় ভাট ফুল। ভাট ফুল গাছ ট্রপিক্যাল ও সাবট্রপিক্যাল জলবায়ুতে বেড়ে ওঠে। ভাট ফুল গাছ চমৎকার ঔষধি গুণ সম্পন্ন উদ্ভিদ। ভাট ফুলের গাছ আয়ুর্বেদিক ও লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
যাদের চর্মরোগ রয়েছে তারা যদি নিয়মিত এই ভাট ফুল রস করে দিনে বার দুই ক্ষত স্থানে মালিশ করতে পারেন তাহলে যে কোন চর্ম রোগ দ্রুত সেরে যাবে। বিষাক্ত পোকামাকড় কামড় দিলে ভাট ফুল ছেঁচে রস করে ক্ষত স্থানে লাগালে ফোলা ও ব্যাথা দ্রুত কমে যায়। ভাট গাছের পাতার রস কৃমি প্রতিরোধে দারুণ কাজ করে থাকে। এতে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড থাকে। ফ্ল্যাভোনয়েড থাকার জন্য এটি ক্যানসার দমনে সহায়ক। এছাড়াও কৃমি, চুলকানি, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার ও উদরাময় প্রভৃতি রোগ নিরাময়ে এটি সাহায্য করে।
শরীরে বিষাক্ত কিছু কামড় দিলে ভাট ফুল রস করে ঐ স্থানে দিলে দ্রুত ব্যাথা কমে এবং বিষক্রিয়া হয় না। অনেকে আবার পেটের কৃমি দূর করার জন্য এ ফুলের রস খেয়ে থাকেন। গৃহপালিত গরু ছাগলের শরীরে উকুন হলে ভাট গাছের পাতা বেটে দুই থেকে তিনদিন লাগালে উকুন মরে যায়। পাতার রস জ্বর ও কাশি নিরাময়ে সাহায্য করে। পাতা সিদ্ধ করে সেই পানি ব্যবহার করলে বাত ও আর্থ্রাইটিসের ব্যথা কমে। চুলকানি বা ফুসকুড়িতে পাতার পেস্ট লাগালে উপকার হয়। শেকড় ও পাতা হজমশক্তি বাড়ায়। পাতা ও ফুল কিছুটা তিতা স্বাদের হয়।
এই উদ্ভিদের পরিবেশগত ভূমিকাও বেশ। ভাট গাছের শেকড় মাটি ধরে রাখে। এর ফুল মৌমাছি ও প্রজাপতিকে আকৃষ্ট করে। বিভিন্ন পতঙ্গ ও পাখির আশ্রয়স্থল। এছাড়া, গ্রামাঞ্চলে প্রাকৃতিক বেড়া হিসেবে লাগানো হয়। কিছু এলাকায় ভাট পাতা পোকা দমনে ব্যবহৃত হয়। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো এটি দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং মাঝে মাঝে আক্রমণাত্মক আগাছা হয়ে যেতে পারে।
0 Comments