সুন্দরবনের নোনাজলে ফিকে হচ্ছে এসএসসির আনন্দ: একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের আকুল আবেদন

 

সংগৃহীত ছবি : দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়ন


নিজস্ব প্রতিবেদক, দাকোপ (খুলনা)

প্রকৃতি যেখানে প্রতিনিয়ত বাঁচার লড়াই শেখায়, সেখানে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখা এক চরম সংগ্রামের নাম। সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের কয়েকশ এসএসসি পরীক্ষার্থীর চোখে এখন স্বপ্নের বদলে অনিশ্চয়তার ছাপ। দোরগোড়ায় পরীক্ষা, অথচ ঘরের কাছে নেই কোনো পরীক্ষা কেন্দ্র। এই এক কেন্দ্রের অভাবে উপকূলের প্রান্তিক পরিবারগুলোতে এখন ঈদের আনন্দের বদলে চলছে অর্থ জোগাড়ের দুশ্চিন্তা।

​দীর্ঘ পথ আর আকাশচুম্বী খরচ

​সুতারখালী ইউনিয়নটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। নদী আর ভেড়িবাঁধই এখানকার যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। এই ইউনিয়ন থেকে উপজেলা সদরে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। ফলে প্রতিদিন বাড়ি থেকে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া অসম্ভব। পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে পরীক্ষার্থীদের আগেভাগেই এলাকা ছাড়তে হয়। দাকোপ উপজেলা সদরে গিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতে হয় মাসখানেক। যাতায়াত, আবাসন ও খাওয়া খরচ মিলিয়ে একেকজন পরীক্ষার্থীর পেছনে ব্যয় হয় অন্তত ২০ হাজার টাকা। নোনাজলের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য এই খরচ মেটানো প্রায় দুঃসাধ্য।

​ঝরে পড়ার শঙ্কা

​খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুতারখালী ইউনিয়নে ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এবার এসব বিদ্যালয় থেকে প্রায় ২৬০ থেকে ২৮০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। যাতায়াত কষ্ট এবং অতিরিক্ত খরচের ভয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ছে। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আবাসন সংকটের কারণে অভিভাবকরা অনেক সময় পরীক্ষা দিতে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হন।

​নির্বাচনের কেন্দ্র হলে পরীক্ষা কেন নয়?

​পরীক্ষা কেন্দ্র না হওয়ার পেছনে অনেক সময় নিরাপত্তা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অজুহাত দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা দুর্গম এলাকা ও পরিদর্শকদের যাতায়াতের অসুবিধার কথা তুলে ধরেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন— যদি জাতীয় নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র এসব দুর্গম এলাকায় নিরাপদে পরিচালিত হতে পারে, তবে পরীক্ষা কেন্দ্র কেন নয়? কয়েকশ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের চেয়ে কি কর্মকর্তাদের যাতায়াতের সুবিধা বড়?

​মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

​বর্তমান শিক্ষা প্রশাসনের নানা ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেছেন। উপকূলের সাধারণ মানুষের দাবি, মাননীয় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী যদি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন এবং সুতারখালী ইউনিয়নে একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের অনুমোদন দেন, তবে বেঁচে যাবে কয়েকশ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন। নোনাজলের এই জনপদে তখন শুধু বেঁচে থাকার লড়াই নয়, বরং স্বপ্ন জয়ের গল্প লেখা হবে।

​পরীক্ষার আগে ধার-দেনা করে টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ক্লান্ত পরিবারগুলো এখন কেবল একটি সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষায়। একটি কেন্দ্র বদলে দিতে পারে সুন্দরবন উপকূলের এই অবহেলিত জনপদের শিক্ষার মানচিত্র।

Post a Comment

0 Comments