![]() |
| দৌলৎগঞ্জ স্থলবন্দরের বাংলাদেশ অংশ |
বিকেলের কণ্ঠস্বর ডেস্ক :
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘দৌলৎগঞ্জ-মাজদিয়া’ স্থলবন্দর। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের এক যুগ পার হলেও আলোর মুখ দেখেনি এই বন্দরটি। উল্টো ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক বন্দরটি বন্ধের ঘোষণায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অবিলম্বে এই বন্দর সচল করা এবং সীমান্ত হাট (বর্ডার হাট) স্থাপনের দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী।
ভৌগোলিক গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যে দৌলৎগঞ্জ-মাজদিয়া রুটটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই বন্দরটি চালু হলে ঢাকা থেকে কলকাতার দূরত্ব বেনাপোলের তুলনায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার কমে যাবে। রাজধানী ঢাকার সাথে যাতায়াতের সময় কমবে অন্তত ২-৩ ঘণ্টা। বর্তমানে বেনাপোল বন্দরে পণ্য খালাসে যেখানে ৩ থেকে ১৮ দিন সময় লাগে, সেখানে দৌলৎগঞ্জ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ২০০ ট্রাক পণ্য দ্রুত খালাস করা সম্ভব। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
ইতিহাসের পাতায় দৌলৎগঞ্জ বন্দর
এই বন্দরের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এটি শুল্ক স্টেশন হিসেবে চালু ছিল। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭২, ১৯৯৮ এবং ২০০৯ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি চালুর উদ্যোগ নিলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকে। ২০১৩ সালে তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও এক যুগেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ গেজেটে এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের দৌলৎগঞ্জ-মাজদিয়া স্থলবন্দরটি অলাভজনক ও অকার্যকর হওয়ায় ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে ।
![]() |
| মাজদিয়া স্থলবন্দরের ভারতীয় অংশ |
তুলনামূলক সারণি (বেনাপোল বনাম দৌলৎগঞ্জ)
কেন এই বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ :
বিষয় | বেনাপোল স্থলবন্দর | দৌলৎগঞ্জ-মাজদিয়া বন্দর |
|---|---|---|
ঢাকা-কোলকাতা দূরত্ব | বেশি (বেনাপোল হয়ে) | ৭০ কিমি কম |
সময় সাশ্রয় | পণ্য খালাসে ৩-১৮ দিন | ১-২ দিনে খালাস সম্ভব |
জট | প্রতিদিন ৫০০-৬০০ ট্রাকের জট | ২০০ ট্রাক অনায়াসেই খালাস |
পরিবহন খরচ | অতিরিক্ত সময় ও দূরত্বের কারণে বেশি | অনেক কম ও সাশ্রয়ী |
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ গেজেটে এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ১৯টি পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
বক্স আইটেম: অনুমোদিত আমদানিপণ্য
২০২২ সালের গেজেট অনুযায়ী এই বন্দর দিয়ে গবাদি পশু, মাছের পোনা, তাজা ফলমূল, গাছ-গাছড়া, বীজ, গম, পাথর, কয়লা, রাসায়নিক সার, চায়না ক্লে, কাঠ, টিম্বার, চুনাপাথর, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, বলক্লে ও কোয়ার্টজ আমদানির অনুমতি ছিল। এছাড়া সকল প্রকার পণ্য রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়েছিল।
অবকাঠামো আছে, নেই শুধু সদিচ্ছা
সরেজমিনে দেখা যায়, দৌলৎগঞ্জ সীমান্তে বন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক ও অবকাঠামোগত সুবিধা বিদ্যমান। বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু মো. আব্দুল লতিফ অমল জানান, "বন্দরে তিন একর জমিতে ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড প্রস্তুত আছে। জিরো পয়েন্টে ৫০ টন ধারণ ক্ষমতার ৩০ ফুট চওড়া রাস্তা এবং জীবননগর পর্যন্ত ২০ ফুট চওড়া সংযোগ সড়ক রয়েছে। ভারতের জাতীয় সড়ক থেকেও এই বন্দরের দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার।"
কেন থমকে আছে এই বন্দর ?
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রচ্ছন্ন বিরোধিতার কারণে এই বন্দরটি আলোর মুখ দেখছে না। সাবেক সংসদ সদস্য আলী আজগর টগর তার নিজ এলাকা দর্শনার দিকে বেশি মনোযোগী থাকায় এবং বেনাপোলের ব্যবসায়িক আধিপত্য হারানোর ভয়ে একটি শক্তিশালী চক্র এই বন্দরের বিপক্ষে কাজ করেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তবে ঝিনাইদহ-৪ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার এই বন্দর বাস্তবায়নে বারবার সংসদে জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন।
![]() |
| চ্যাংখালী জিরো পয়েন্ট |
বর্ডার হাটের দাবি
বন্দরের পাশাপাশি সীমান্তবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি একটি 'বর্ডার হাট'। ১৯৬৫ সালের আগে এখানে সীমান্ত হাট সচল ছিল। পুনরায় এই হাট চালু হলে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বন্ধ হবে এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য শুল্কমুক্তভাবে কেনাবেচার সুযোগ তৈরি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
জীবননগরবাসীর দাবি, জাতীয় স্বার্থে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন বন্দর বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চুয়াডাঙ্গা চেম্বার অব কমার্সের অভিমত, বন্দরটি চালু হলে কর্মসংস্থান হবে হাজার হাজার মানুষের, আর চুয়াডাঙ্গা পরিণত হবে দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাবে।



0 Comments