রহস্যে ঘেরা শালবাহান তেল খনি: উত্তোলনের আগেই কেন বন্ধ হয়েছিল পঞ্চগড়ের স্বপ্ন?

 

শালবাহান তেল খনি , পঞ্চগড়


নিজস্ব প্রতিবেদক | পঞ্চগড় : উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান গ্রাম। একসময় এই জনপদটি খবরের শিরোনাম হয়েছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ তেলের খনি প্রাপ্তির সংবাদে। আশির দশকে এই খনিকে ঘিরে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল, তা আজ কেবলই দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। ৯৯ শতাংশ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে খনির মুখ সিলগালা করে দেওয়ার নেপথ্যে রাজনৈতিক চাপ নাকি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল—সেই প্রশ্ন আজও তাড়িয়ে বেড়ায় পঞ্চগড়বাসীকে।

আবিষ্কারের ইতিহাস ও বিপুল সম্ভাবনা

​শালবাহান তেল খনির প্রেক্ষাপট শুরু হয় ১৯৮৬-৮৭ সালে। বাংলাদেশ সেল, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়ার যৌথ সমীক্ষার পর খনিজ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়, তেঁতুলিয়ার শালবাহান ইউনিয়নে মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে। তৎকালীন সময়ে একে দেশের প্রথম তেল খনিজ মজুদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

​পরবর্তীতে ফরাসি কোম্পানি ‘ফরাসল’ টানা দুই বছর অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত করে যে, মাত্র ৯০০ মিটার গভীরে উত্তোলনযোগ্য তেল রয়েছে। পেট্রোলিয়াম ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অধীনে এই খনির অবস্থান সুনির্দিষ্ট করা হয়।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব ও বড় বিনিয়োগ

​১৯৮৮-৮৯ সালের জাতীয় বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য তৎকালীন সরকার ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। সরকার শালবাহান এলাকায় ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ফরাসি কোম্পানির কারিগরি সহায়তায় ৮ হাজার ফুট গভীর এবং ১২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের একটি কূপ খনন করা হয়। ১৯৮৮ সালের ১০ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ নিজেই উপস্থিত হয়ে এই তেল খনির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং দ্রুত তেল উত্তোলনের ঘোষণা দেন।

রহস্যময় সমাপ্তি: হেলিকপ্টার ও সিলগালা

​খনিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য এবং সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় একটি হেলিকপ্টার খনি এলাকা কয়েকবার প্রদক্ষিণ করে যাওয়ার পরপরই দৃশ্যপট বদলে যায়। হঠাৎ করেই বিশেষজ্ঞ কোম্পানি ‘ফরাসল’ দাবি করে যে, সেখানে উত্তোলনযোগ্য তেল নেই।

​এর পরপরই টানা তিন দিন ধরে সিমেন্ট ও সিসা ঢেলে তেলের কূপটির মুখ স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, এখান থেকে তেল উত্তোলন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে না।

ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

​শালবাহান কূপ পরিত্যক্ত ঘোষণার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ নিয়ে জনমনে ও গণমাধ্যমে জোরালো বিতর্ক রয়েছে:

১. আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ: খনিটি ভারত সীমান্তের অতি নিকটে হওয়ায় রাজনৈতিক কারণে এটি বন্ধ করা হয়ে থাকতে পারে।

২. সীমান্তবর্তী উত্তোলন: স্থানীয়দের দাবি, শালবাহান থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার রায়গঞ্জ থানার জমিদার পাড়া গ্রামে ভারত তেল কূপ খনন করেছে। অভিযোগ রয়েছে, একই খনি স্তর থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ তেল উত্তোলন করলেও বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

​১৯৮৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রে এই খনি বন্ধের বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এরপর দীর্ঘ তিন দশকেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শালবাহানে পুনরায় কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা তেল অনুসন্ধানের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

​বর্তমানে শালবাহানের সেই অধিগ্রহণকৃত জমি ও খনি এলাকাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয়দের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় পরীক্ষা করা হলে হয়তো বেরিয়ে আসতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার এক নতুন দিগন্ত।

Post a Comment

0 Comments